fbpx
25.6 C
Barisāl
Wednesday, April 21, 2021

সুরস¤্রাট আব্বাস উদ্দীনের ৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আব্বাসউদ্দীন আহমদ এক কালজয়ী সংগীত প্রতিভা। বিশ^বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। একাধারে তিনি সুরজ্ঞ, সুরকার, সংগীত তারকা এবং বাংলা গজল, হামদ, নাত, ইসলামি সংগীতের জনক। অন্যদিকে ‘ভাওয়াইয়া স¤্রাট’ হিসেবে আজও পূজনীয়। পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহাকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সনের ২৭ অক্টোবর। তার পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহাকুমা আদালতের উকিল। বলরামপুর স্কুলে আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯১৯ সনে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সনে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এখান থেকে বিএ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। আবদুল করিম, গোলাম মোস্তফাসহ অনেক বিদগ্ধ মনীষী তাঁর গানের গীতিকার। তবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা-গান দিয়েই তিনি রেকর্ড গড়েন। নজরুল দিয়েছেন বাণী- আর কণ্ঠের মধু ঢেলে রেকর্ডের মাধ্যমে আব্বাসউদ্দীন সে বাণীকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেশের মানুষের মাঝে। গানে গানে, কথায় কথায় সারা দেশের মানুষকে তিনি মাতিয়ে তুলেন পুরো সিকি শতাব্দি। গলার কাজ, সুরের মাধুর্যিক উৎকর্ষতা, কণ্ঠের জাদু সমবেত শ্রোতাদের সংক্রামকের মতো প্রভাব বিস্তার করত। জনপ্রিয়তা, লোকপ্রিয়তায় তিনি আজও অদ্বিতীয়। বাংলা তমদ্দুনিক ইতিহাসে এক রোমা কর অধ্যায়ের ¯্রষ্টা আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
কৈশোরে আব্বাস কবিতা লিখতেন। শিক্ষক ও সতীর্থদের কাছ থেকে কাব্যরতœ খেতাবও পেয়েছিলেন। গল্প লেখারও অভ্যাস ছিলো। কিন্তু গানের জগতে প্রবেশের পর ওদিকে আর অগ্রসর হননি। তবে কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদ মোট চারটি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। বিষ্ণুমায়া (১৯৩২), মহানিশা (১৯৩৬), একটি কথা ও ঠিকাদার(১৯৪০)। এসব সিনেমায় তিনি গানও করেছিলেন। তখন আজকের মতো প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটেনি। টেলিভিশন, ইউটিউব, ইন্টারনেট ছিলো গরহাজির। গ্রামোফোন রেকর্ড, ম , সিনেমার প্লেব্যাক বা উন্মুক্ত মাঠই ছিলো গান পরিবেশনের একমাত্র মাধ্যম। স্কুল-কলেজের চ্যারিটি শো, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপনের জন্য বিচিত্রানুষ্ঠান, সরস্বতীপূজার জলসা, মিলাদানুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, পুরস্কার বিতরণী সভা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ এরকম হাজারো রকমের জনসমাগমে প্রধান আকর্ষণ থাকত আব্বাসউদ্দীন। বিশেষত: গ্রামোফোন রেকর্ডের কল্যাণে দেশের প্রত্যন্ত অ লে তাঁর সুনাম সুখ্যাতি পৌঁছে যায়।
সময়ের প্রয়োজনে তিনি দেশে বিদেশে সফর করেন। আব্বাসউদ্দীনের শুভাগমনে দুবার বরিশালের মাটি ধন্য হয়। প্রথমবার ১৯৪০ সনে আর দ্বিতীয়বার ১৯৫৭ সনে। ১৯৪০ সনে বানারীপাড়া উপজেলার চাখারে শেরেবাংলা ফজলুল হক পৈতৃক বাড়িতে ৩৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন চাখার সরকারি ফজলুল হক কলেজ। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর ব্রিটেনের লেডি হারবার্ট কলেজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। কলেজ উদ্বোধনের দিন আব্বাসউদ্দীন ছিলেন দাওয়াতি মেহমান।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি আব্বাসকে বললেন, তুমি কিন্তু যাবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গাইতে হবে।’ কলকাতা থেকে প্রায় ৫০-৬০ জন সফরসঙ্গী শেরেবাংলার সঙ্গ নিয়েছেন। আব্বাসউদ্দীন পরের ট্রেনে রওনা হলেন বরিশালের উদ্দেশে। রাত চারটার সময় হুলারহাট স্টেশনে ছোট্ট লে উঠতে যাচ্ছেন, এমন সময় শেরেবাংলা বাইরে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘সবাই চলে গেছে, চাখার। আমি তোমাকে নেবার জন্য ল নিয়ে অপেক্ষাতে আছি। এত দেরি করলে কেন? অবাক হবার পালা আব্বাসের। তার মতো সামান্য একজন অধীনস্থ কর্মচারীর জন্য রাত চারটার সময় স্টেশনে অপেক্ষা করছে বাংলার প্রধানমন্ত্রী। লে ওঠে সেই ভোররাতে প্রধানমন্ত্রীর হুকুমে পোলাও কোর্মা খেতে দিলেন আব্বাসকে। শেরেবাংলাও খেতে বসলেন আব্বাসের সাথে।
– এই অজ পাড়াগায়ে একটা কলেজ বানিয়ে আপনি মহাসর্বনাশ করেছেন। স্মিতহাস্যে বললেন আব্বাসউদ্দীন।
– আমি এতো কষ্ট করে কলেজ বানালাম। আর তুমি বলছো সর্বনাশ করছি। অভিমানের কণ্ঠে বললেন হক সাহেব।
– সর্বনাশ হলো এই কারণে যে, ম্যাট্টিক পাশ করে কোথায় তারা যাবে কলকাতায়। দেখবে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা, সিনেমা, থিয়েটার। ঘুরবে ট্রেনে, বাসে, ট্রাক্সিতে। তা নয় সেই বৈঠা ঠেলে ঠেলে আবার আসবে কলেজে পড়তে। এবার হো হো করে হেসে উঠলেন শেরেবাংলা। (জহুরুল আলম সিদ্দিকী: ছোটদের সংগীতশিশল্পী আব্বাসউদ্দীন, পৃ ৯০-৯১)
এ প্রসঙ্গে তিনি জীবন কাহিনিতে লিখেছেন, ‘বাংলার লাট আসবেন চাখার কলেজ উদ্বোধন করতে। কলেজ হোস্টেলের ছেলেরা আমাকে হোস্টেলে নিয়ে গেল। বিস্কুট দিয়ে মালা গেঁথে আমার গলায় পড়িয়ে দিয়েছে। বললাম ‘‘এ মালা যে বেশীক্ষণ গলায় রাখতে পারব না, মালার গন্ধ যে উদরে জ¦ালিয়ে দিচ্ছে ক্ষুধার হতাশন’’। ছাত্রদের এক মজার বক্তৃতা শোনালাম। … তোমাদের আজ মহাসুদিন, এমনভাগ্য বাংলাদেশের ছেলেদের কজনের হয়েছে। কলকাতা তো একদিন যাবেই বিএ পড়তে; কিন্তু আরও যে দুটি বছর শান্তশ্রী পল্লীর বুকে মায়ের কোলে থেকে গ্রামের খাঁটি দুধ খেয়ে উচ্চশিখরে দুটো ধাপ এইখান থেকেই উঠতে পারবে এ কি কম কথা। কথায় কথায় কলকাতার মত দালানে দৃষ্টি আছাড় খেয়ে পড়বে না। যেদিকে তাকাও নীল আর সবুজ সবুজ আর নীল। তোমাদের মনটিও থাকবে এমনি চির সবুজ- চির-তাজা।’ (আব্বাসউদ্দীন আহমদ: আমার শিল্পী জীবনের কথা, পৃ ৬৮)
১৯৫৭ সনে বরিশালে অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য সম্মেলন। এই সম্মেলনের মধ্যমণি ছিলেন আব্বাসউদ্দীন। ঢাকা থেকে আগত সাহিত্যিক ও শিল্পীগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, কিংবদন্তী সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন, বেগম শামসুন্নাহার, ঐতিহাসিক ড. এম আবদুল কাদের, শিশু সাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, ড. নিলীমা ইব্রাহিম, মাহবুবা রহমান, শ্রী শোভা দে, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখ। কবি বন্দে আলী মিয়া এই সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘নারায়ণগঞ্জ থেকে ইস্টিমার ছেড়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণী রিজার্ভ করা হয়েছিল- আমরা ছাড়া আর কোন যাত্রী নেই। সকলের কথায় গল্পে রাত্রি গভীর হতে লাগলো। তারপর বসলো সঙ্গীতের আসর। আব্বাসউদ্দীন হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন। আমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন আঁখি থেকে ঘুম পালিয়ে গেল। প্রহরের পর প্রহর কাটতে লাগল। রজনী গভীরতর হলো, তথাপি আমাদের ক্লান্তি নেই। ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশ সাদা হয়ে এল। এমনি করে কেটে গেল দীর্ঘ রাত্রির প্রহরগুলো। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠের সম্মোহন এবং আকর্ষণশক্তি ছিল এত প্রবল। বরিশালের সাহিত্য সম্মেলন আব্বাসউদ্দীন উদ্বোধন এবং বিদায় সঙ্গীতে সার্থক হয়ে উঠেছিল।’ (আল মাহমুদ সম্পাদিত আব্বাসউদ্দীন, পৃ ১১)
আব্বাসউদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ আমার শিল্পী জীবনের কথা ১৯৬০ সনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর জীবনালেখ্য। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স লাভ করেন ১৯৬০ সনে, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন ১৯৭৯ সনে এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন ১৯৮১ সনে। ১৯৫৯ সনের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ইসলামি গান ও পল্লীগানের এই মহানায়কের জীবনাবসান ঘটে।
বরিশালে অখ্যাত, অপরিচিত, অজানা, অচেনা লোকের নামেও রয়েছে নানাবিধ স্থাপনা। অথচ ইতিহাসের মহান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের নামে নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম। সড়ক, এভিনিউ, সংগীত একাডেমি, স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের নামকরণ তাঁর নামে হতে পারত। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে চরম উদাসীন। এই অবিমৃশ্যকারিতার অবসান হোক।

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পর্কিত সংবাদ