fbpx
25.3 C
Barisāl
Thursday, May 13, 2021

ফেঁসে যাচ্ছেন বরিশাল জেলা প্রশাসনের সেই ভূমি কর্মকর্তা

সরকারের প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমিদস্যুদের রেকর্ড করিয়ে দেয়ার অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন বরিশাল (সদর) ভূমি অফিসের সাবেক সহকারী কমিশনার নাজমুল হুসাইন খান (পরিচিতি নম্বর-১৬৭৭৩)। বর্তমানে তিনি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার পদে কর্মরত রয়েছেন।
সম্প্রতি সময়ে “বরিশাল নগরীতে ১৫ কোটি টাকার সরকারী সম্পত্তি বেহাত” শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সরকারী সম্পত্তি ব্যাক্তি মালিকানায় পাইয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে মন্ত্রী পরিষদ নির্দেশিত বেশ কয়েকটি টিম তদন্ত শুরু করেছেন। আর এতেই বিপাকে পরেছেন নাজমুল হুসাইন খান।
বরিশাল জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা অধিশাখার উপ-সচিব মোঃ শাফায়াত মাহাবুব চৌধুরী (১৪-১১-২০১৭ইং তারিখ) স্বাক্ষরিত আদেশে নাজমুল হুসাইন খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয় তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন এক মাসের মধ্যে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণের নির্দেশনা দিয়েছেন বরিশাল জেলা প্রশাসককে। বিষয়টি সত্যতা স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান।
সূত্রমতে, নাজমুল হুসেইন খান ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিসে যোগদান করেন। তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে পটুয়াখালী জেলার বাউফলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে তাকে পোস্টিং দেয়া হয়। বাউফলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে যোগদানের পর সাধারণ মানুষের সাথে ঘুষের টাকা নিয়ে মারপিট করার অভিযোগে উঠলে নাজমুলকে বাউফল থেকে বদলী করে বরিশালে আনা হয়। এক পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার নাজমুলকে বরিশাল জেলা সদর (ভূমি) অফিসে যোগদানের নির্দেশ দেন। সদর (ভূমি) অফিসে যোগদানের পরপরই নাজমুল হুসেইন খান বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
২০১৬ সালের জুন মাস থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত তিনি বরিশাল সদর ভুমি অফিসের সহকারী কমিশনার পদে থাকাকালীন অবৈধভাবে সরকারের প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তি চিহ্নিত ভুমিদস্যুদের পাইয়ে দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নগরীর ২৫ নং ওয়ার্ডের রুপাতলী মৌজার অর্থাৎ র‌্যাব-৮ এর স্থায়ী কার্যায়ের সম্মুখে সরকারে প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের খাস জমি (অর্পিত সম্পত্তি) রুপাতলীর বাসিন্দা মৃত মোঃ আলী হাওলাদারের পুত্র মোকছেদ আলী মানিক হাওলাদার ও কাশেম আলীর পুত্র সিরাজুল ইসলাম বাবুকে ভূমি অফিসের কর্মচারীদের যোগসাজসে মোটা অংকের টাকার বিনিময় জালজালিয়াতির মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন করে দিয়েছেন। যা সরকারী বিধান পরিপন্থি।
সূত্রে আরও জানা গেছে, রুপাতলী মৌজার জেএল নম্বর-৫৬, এসএ ১৮৫০ নং খতিয়ানের ১১৪৬ নং দাগের ৭২ শতক সম্পত্তির মূল মালিক রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা হারান চন্দ্র পালের পুত্র জতিন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ পাল। তাদের কোন বৈধ ওয়ারিশ না থাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তির ওপর নজর পরে মোকছেদ আলী, মানিক হাওলাদার এবং সিরাজুল ইসলাম বাবুসহ ভূমি খেকোদের। ২০১৪ সালে ৭২ শতক জমি রেকর্ড করার জন্য সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার বরাবর আবেদন করেন উল্লেখিতরা।
আবেদনের সময় তাজকাঠী সাকিনের জনৈক মেছেরউদ্দিন হাওলাদারের পুত্র আব্দুল মজিদ হাওলাদারের নামে (ডিগ্রী) করার কপি রেকর্ড করার জন্য জমা দিলে বিষয়টি সন্দেহ হয়। ২০১৪ সালে তৎকালীন সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দেশপ্রিয় চক্রবর্তী রেকর্ড রুমে সার্সিং দিয়ে জানতে পারেন ৭২ শতক জমির আসল মালিক রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা হারান চন্দ্র পালের পুত্র জতিন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ পাল।
তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইলিয়াছুর রহমান বরাবর খাস (অর্পিত সম্পত্তি) মর্মে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দেশপ্রিয় চক্রবর্তী। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৯ তারিখ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইলিয়াছুর রহমান তৎকালীন তহশীলদার, সার্ভেয়ার ও কানুনগুকে সরেজমিনে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তদন্তকারীদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৭২ শতক জমি, ভূমি আইন ৯২ ধারার মোতাবেক খাস করার প্রস্তাব দেয়া হয়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম সরেজমিনে তদন্ত করে ওই জমির কোন বৈধ মালিকানা না থাকায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমি আইন ৯২ ধারার বিধান মতে এক নং খাস খতিয়ানের আওতায় নেয়ার জন্য প্রস্তাব দিতে নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ওই জমি খাস খতিয়ানে অর্ন্তভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেন।
এ ঘটনার মাত্র এক বছরের মধ্যে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে এক মাস ২৩ দিনের স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘণ ঘণ তারিখ দিয়ে রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা মৃত মোঃ আলী হাওলাদারের পুত্র মোকছেদ আলী মানিক হাওলাদার এবং কাশেম আলীর পুত্র সিরাজুল ইসলাম বাবুর পক্ষে ৩৭/০২ নং একটি দেওয়ানি মামলার বরাদ দিয়ে ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই মিস কেস নম্বর-১০৫ কেটি ২০১৪-১৫ (১৫০) ধারা মোতাবেক ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখ মামলাটি নিম্পত্তি করেন বরিশাল (সদর) ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (তৎকালীন) নাজমুল হুসাইন খান। পাশাপাশি সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উঃভূঃঅঃ/বরি/সদর/২০১৬-১৭১৪ নং স্মারকপত্রের মাধ্যমে আদেশ মোতাবেক রেকর্ড সংশোধন করে তামিল প্রতিবেদন বরিশাল সদর ভূমি কমিশনারের কার্যালায়ে প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
অপরদিকে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ এনে নগরীর আলেকান্দা এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ সরোয়ার হুসাইন বাবলা বরিশাল (সদর) ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার নাজমুল হুসাইন খানের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে (২৪৮১/১৬) সিভিল রিভিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় নাজমুলের রিরুদ্ধে শোকজ দেয়া হয়। নাজমুল শোকজের কোন জবাব না দিয়ে বাবলার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেন। পরবর্তীতে বাবলা, নাজমুলের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট থেকে সিভিল রুল নং-৩২০ (কন্টেইট আর) মামলা দায়ের করেন। ২০১৭ সালের জুন মাসের ৫ তারিখ নাজমুলের বিরুদ্ধে আদালত কন্টেইট আদেশ প্রদান করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর বাবলার দায়ের করা লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, বরিশাল (সদর) ভূমি অফিসের সাবেক সহকারী কমিশনার নাজমুল হুসাইন খানের পিতা ফারুক খান ফরিদপুর জেলার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ফারুক খান জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদীর সক্রিয় আলবদর বাহিনীর সৈনিক ছিলেন। ফারুক খান ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই ফরিদপুর জেলা ত্যাগ করে ঢাকা জেলার বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করেছিলেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ফারুক খান ঢাকা জেলার তেজগাঁও থানার পশ্চিম নাখালপাড়ায় বসবাস করেন এবং ঢাকা জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে নাজমুল হুসেইন খান সহকারী কমিশনার হিসেবে চাকরী নেন। পিতার স্থায়ী ঠিকানা ফরিদপুরে হওয়া সত্বেও পুলিশ ভেরিফিকেশনে নাজমুলের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সম্পর্ক বিষয়সহ সকল গোপন তথ্য প্রকাশ হওয়ার ভয়ে সু-চতুর নাজমুল পিতার স্থায়ী ঠিকানা ফরিদপুরে ব্যবহার করেননি। এদিকে দুর্নীতির কারনে নাজমুলকে অন্যথায় বদলী করা হচ্ছে জানতে পেরে গোপনে তদবীর করে বরিশাল কালেক্টরেটে সহকারী কমিশনার হিসেবে তিনি বদলি হন।
যদিও অভিযোগের বিষয়টি খন্ডন করতে চেয়েছেন অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার নাজমুল হুসাইন খান। তিনি জানান, ‘খ’ তফসিলের সম্পত্তি সরকারের কোনভাবেই দাবী করার সুযোগ নেই। এছাড়া তদন্তনাধীন অন্যান্য অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে, তিনি ফোনে জবাব দিতে অপরগতা প্রকাশ করেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, নাজমুল হুসাইন খানের দুর্নীতির বিষয় যে অভিযোগ মন্ত্রীপরিষদ থেকে এসেছে সেটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল কালাম আজাদকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তনাধীন। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “খ” তফসিলভূক্ত সম্পত্তি এসিল্যান্টের এখতিয়ারে রয়েছে। তিনি সন্তুষ্ট হলে “খ” তফছিল সম্পত্তি আইনগত তার অবমুক্ত করে দিতে পারেন। জেলা প্রশাসক দাবী করেন, নথিটা আমি দেখেছি; দুইভাবেই বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। নথিতে অস্পষ্টতা রয়েছে। আমি এডিসি রেভিনিউকে বলেছি এসিল্যান্ডের রায় বাতিলক্রমে এটা মূল খতিয়ানে সংযুক্ত করতে। যাতে সরকারের স্বার্থহানী না ঘটে।

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পর্কিত সংবাদ