fbpx
31.3 C
Barisāl
Tuesday, June 22, 2021

সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ায় আগৈলঝাড়ার ঐতিহ্যবাহী গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আনন্দ

অনেক আশা ও সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পেল। ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে সরকারি ঘোষনা পাওয়ার পর বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীসহ উপজেলার সকল স্তরের জনগন আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে। গত ২৪ আগস্ট ২০১৭ইং বিদ্যালয়টি সরকারি করনের তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক (মন্ত্রী) আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সকল কর্মকর্তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক মন্ডলী, কর্মচারী, সকল শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সর্বসাধারনের পক্ষে বিদ্যালয়ের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মোল্লা, প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক, দৈনিক সমকালের উপ-সম্পাদক অজয় দাশ গুপ্ত, সহকারী শিক্ষক সরোয়ার হোসেন, নির্মল ভদ্র, কাইউম লস্কর, মাহমুদ আলম মিঠু, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সরোয়ার দাড়িয়া, জাকির হোসেন মানিক মোল্লা, ইস্তেয়াকুর রহমান শাহিন, সেলিম সরদার, প্রেসক্লাব সহ-সভাপতি এস এম শামীম, এনজিও পরিচালক কাজল দাশ গুপ্ত প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ি উপজেলা পর্যায়ে একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয় করণের ঘোষণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় করনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে সরকার থেকে উপজেলা পর্যায়ে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ‘মডেল বিদ্যালয়’ রূপান্তরিত করতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি’র সর্বোচ্চ অবদানের কথা স্মরণ করে গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত পত্র অনুযায়ি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদনকৃত তাদের গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি চূড়ান্তভাবে জাতীয় করণের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের ৫একর ৫৫শতক জায়গাসহ নির্মিত ভবনসমুহ, গাছপালা, আসবাবপত্র, স্থাবর-অস্থাবরসহ সরকারী মূল্য হিসেবে ১০কোটি ২৩লাখ ১৬হাজার ৬শ ১৭টাকার মূল্যের সম্পত্তি বিদ্যালয় সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক দাতা হিসেবে স্বাক্ষর করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ) এর বরাবরে ৯অক্টোবর (রবিবার) আগৈলঝাড়া সাব-রেজিষ্ট্রার এমএ জলিল “ডিড অফ গিফট” দলিল সম্পাদন করেন। যার দলিল নং-১৭০০। উল্লেখিত সম্পত্তি হস্তান্তরের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জিও প্রদানের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি সরকারী করণ চূড়ান্তভাবে ঘোষনা করে।
বরিশাল বিভাগের দ্বিতীয় মাধ্যমিক ও এ অ লের সবচেয়ে প্রচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ হচ্ছে গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, সাবেক মন্ত্রী শহীদ আঃ রব সেরনিয়াবাত ও প্রয়াত মন্ত্রী সুনীল কুমার গুপ্ত, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্রিগেডিয়ার এম এ মালেক (অবঃ), সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন, দৈনিক সমকালের উপ সম্পাদক অজয় দাস গুপ্ত, কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল তটিনী গুপ্তা, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমিয় দাশ গুপ্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী সুরেন্দ্র নাথ গুপ্ত, ইঞ্জিনিয়ার এম শাহআলমসহ অসংখ্য কৃতীমান ও কৃর্তিময় ব্যক্তির স্মৃতি বিজড়িত গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও বর্তমানে দেশ-বিদেশে কর্মরত অসংখ্য গুনী ব্যক্তি ছিলেন গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২০০৮ সালে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মডেল হাইস্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এলাকার প্রতিটি ঘরের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য ১৮৯৩ সালের ২৩ জানুয়ারী ফুল্লেশ্রী গ্রামের শিক্ষানুরাগী কৈলাশ চন্দ্র সেন প্রথমে গৈলা কালুপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দাসের বাড়িতে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় দাসের বাড়ির সম্পত্তির ওপরেই বর্তমান স্থানে স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়। গৌরনদী-গোপালগঞ্জ মহা সড়কের পাশ্ববর্তী আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা নামক স্থানে বর্তমানে এ বিদ্যালয়টির অবস্থান। এ বিদ্যালয়টি এতদা লের সর্ব প্রথম মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল। দাসের বাড়ির সেই বিদ্যালয়টি আজ অত্র এলাকার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। স্কুলের পাশেই রয়েছে ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দক্ষিনা লে সড়ক পথে সর্ব প্রথম সম্মুখ যুদ্ধে নিহত শহীদ সিপাহী আলাউদ্দিন ওরফে আলা বাক্রের সমাধিস্থল। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে এক হাজার চারশত দুই জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত রয়েছে। আর তাদের পাঠদানের জন্য নিয়োজিত রয়েছে ১৯জন শিক্ষক, ৩জন তৃতীয় শ্রেণি ও ৪জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ মোট ২৮জন স্টাফ রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ সহ আশাব্যঞ্জক ফলাফল করে কৃতিত্ব অর্জন করে আসছে। প্রতিবছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে সৈয়দ আবুল হোসেন ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। ১২৫ বছর হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ বিদ্যালয়টি গোটা জেলার মধ্যে একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। এ বিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেক শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। ১৮৯৩ সনে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু হবার পর ওইসময় অনেক শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। বৃহত্তর বরিশালে শিক্ষার প্রসার এবং সার্বিক উন্নয়নে তার অবদান চিরস্মরনীয়। গৈলা হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক উপজেলার ফুল্লেশ্রী গ্রামের মজুমদার বাড়ীর সন্তান কৈলাশ চন্দ্র সেন। ওই সময় তিনি বিএ পাস করে সরকারী উচ্চ পদে চাকুরি নেন। কিন্তু এলাকার মানুষের শিক্ষার কথা ভেবে এবং স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় এলাকাবাসীর আমন্ত্রনে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘ ৩৭ বছর সুনামের সঙ্গে তিনি স্কুল পরিচালনার কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন। গৈলা স্কুলে তার একটি স্মৃতি সৌধ রয়েছে। তাতে লেখা আছে সত্যিই মৃত্যু তাকে গৈলার মানুষের মন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। এখনও তার স্মৃতি সজীব সতেজ এবং তিনি সবার জন্য প্রেরনা হয়ে আছেন। গৈলা স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে শিক্ষা দীক্ষায় গৈলার ক্ষ্যাতি ভারতবর্ষসহ বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৫ সালে গৈলার ২জন ছাত্র কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। ওই স্কুলের ছাত্রী তটিনি গুপ্তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্ট্র্যাস পরিক্ষায় দ্বিতীয় হয়ে এবং আইএ পরিক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। বিএ ও এমএ পরিক্ষায় তিনি কৃতিত্ব দেখান। তিনিই এলাকার প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট। কর্মজীবনে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দ্বায়ীত্ব পালন করেন। গৈলা স্কুলে আরেক প্রাক্তন ছাত্র সুরেন্দ্র নাথ গুপ্ত ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯২২ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এ ছাড়া ওই গ্রামের তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি লাভ কারী। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তার লেখা ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস ৫ খন্ডে প্রকাশ করেন। জানাগেছে গৈলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে ডক্টরেট, ইঞ্জিনিয়রিং, চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল গ্রাজুয়েট, গ্রাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন। এ অ লের শিক্ষা দীক্ষায় গৈলা স্কুলের অন্যান্য সাধারণ ঐতিহ্য এখন ও বহমান। তবে সেকালে এতো উচ্চ শিক্ষা এতদা লের কোথায়ও ছিলনা বলে জানা যায়। স্কুলের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য বৃত্তি প্রচলনসহ বিভিন্ন উদ্দ্যোগ প্রশংসনীয় ছিল। সরকারি অনুমোদন পাওয়াতে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক তার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ি সকল নিয়ম নীতি ও শর্ত পূরন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। তাই সকলের সহযোগীতা ও নিয়মানুযায়ী আমাদের ১শ ২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে।

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পর্কিত সংবাদ